সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১৮ মার্চ ২০২৩, ০৯:০৪ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বিব্রত সরকার সমর্থক আইনজীবীরাও

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী (বার) সমিতির একতরফা নির্বাচন নিয়ে চারদিকে সমালোচনা চলছে। দেশের অন্যতম প্রভাবশালী এই বার সমিতির নির্বাচন ঘিরে অধিকাংশ আইনজীবীই ব্রিবত ও লজ্জিত। বিব্রত আওয়ামী লীগ সমর্থক অনেক আইনজীবীও। তারা বলছেন, বার সমিতিকে অতিমাত্রায় রাজনীতিকীকরণের ফলে আজ এ অবস্থায় পৌঁছেছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো আইনজীবী সমাজকে। পুলিশি লাঠিচার্জে সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবীরা আহত হয়েছেন। এতে তাদের ভাবমূর্তি চরমভাবে নষ্ট হয়েছে। নির্বাচনের নামে প্রহসন চালিয়ে তাদের বিব্রতকর ও লজ্জায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমান সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান গতকাল বলেন, ৪৪ বছরের পেশাগত জীবনে আমি এ ধরনের ঘটনা দেখিনি। চরম সামরিক শাসন যখন চলেছে, তখনো কিন্তু পুলিশ এমনটা করতে সাহস করেনি। সমিতিকে সুপ্রিম কোর্টেরই একটি অংশ বলা যেতে পারে। যেখানে প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারপতিরা সার্বক্ষণিক বসেন, সেখানে পুলিশ এসে আইনজীবীদের ওপর হামলা করেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না।

জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবী বলেন, নির্বাচনের দুদিন আগে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান মনসুরুল হক চৌধুরী পদত্যাগ করলেন। এরপর নির্বাচনটা পুনর্নির্ধারণ করা উচিত ছিল। সর্বসম্মত কমিশন ও সাব-কমিটি করে নির্বাচন আয়োজন করলে ভালো হতো। সমিতিকে অতিমাত্রায় রাজনীতিকীকরণ সর্বনাশ করে দিচ্ছে। এমনভাবে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে, যেখানে বারের কোনো স্বাধীনতা নেই, স্বতন্ত্রতা নেই। শক্তিশালী বারের যে ধারণা, সেটিও চলে গেছে। বারকে বিরাজনীতিকীকরণ করতে হবে। যারা এখানে প্র্যাকটিস করেন, তারাই ভোট দেবেন।

বিএনপির আইনজীবীরা পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন, সেটি তারা করতেই পারেন উল্লেখ করে এম কে রহমান বলেন, আমার কথা হলো—সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের বারের নির্বাচনে প্রতিবছর প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট পড়ে। সেখানে এবার ভোট পড়েছে অর্ধেকেরও কম। অনেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবীও ভোট দিতে আসেননি। এটি সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে হয়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা করণীয়, তা-ই করা উচিত ছিল।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও দুদকের প্রধান আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, নির্বাচনটা কনটেসটেড (প্রতিযোগিতাপূর্ণ হলে) আরও ভালো হতো। আরও গ্রহণযোগ্য হতো। এর বিস্তারিত কিছুই আমি বলব না।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম কালবেলাকে বলেন, এটা কোনো নির্বাচনই হয়নি। নির্বাচনের নামে প্রহসন করা হয়েছে। এটার কি প্রয়োজন ছিল? আমাদের অপমান করা হয়েছে। আইনজীবীদের ভাবমূর্তি শেষ করে দেওয়া হয়েছে। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণি হিসেবে আইনজীবীদের সমাজে যে ভাবমূর্তি ধরে রাখা হয়েছিল, তা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির আওয়ামী ফোরাম থেকে নির্বাচিত সাবেক সহসম্পাদক ও সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, সমিতির নির্বাচনের কোনো পরিবেশই আমি দেখিনি। নির্বাচন হয়েছে কি না, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। আইনজীবীদের রাজনৈতিক দলের প্যানেলে নির্বাচন করার বলয় ভাঙতে হবে। এ ছাড়া কোনো আইনজীবী একাধিক বার সমিতির হলেও একটি বারে ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে।

বর্তমান সরকারের আমলে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আমাতুল করিম বলেন, এটা কোনো নির্বাচন হয়নি, একটা প্রহসন হয়েছে। যারা করেছে, তারা আসলে পরাজিত মুখ। যারা বিজয়ী বেশে মালা নিচ্ছে, তারা সবাই পরাজিত মুখ। তারা স্বচ্ছ নির্বাচনকে ভয় পায়। তাদের জন্য বিন্দুমাত্র সমবেদনা দেখানোর অবশিষ্ট কিছু নেই। তাদের প্রতি আছে শুধুই ঘৃণা। আমরা এগুলো মানি না। এর দায় সবাইকে নিতে হবে। এ ঘটনার জন্য আইনজীবী সমাজ চরমভাবে বিব্রত।

তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতিবছর নির্বাচন করি একজন নেতা পাওয়ার আশায়। ব্যারিস্টার খোকন ভাই এই প্রক্রিয়াটাকে জঘন্যভাবে ধ্বংস করেছেন। তারা নিজস্ব ভোট ব্যাংক তৈরি করতে গিয়ে অযোগ্যদের ভোটার করেছেন। পরে এসে কাজলসহ একটি গ্রুপ নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় এমন সব ভোটার তৈরি করেছেন যারা, সুপ্রিম কোর্টের ম্যানার জানে না। আজ পুলিশ এসে আমার বোনকে আঘাত করল। এত নিচে নেমে গেছি আমরা। মনসুরুল হক চৌধুরী স্যারকে নিয়ে বাজে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু স্যার আমাকে বলেছেন, স্যারের অনুমতি ছাড়া ব্যালেট পেপার ছাপানোর কারণে স্যার নির্বাচন থেকে সরে গেছেন। এ ছাড়া স্যার বলেছেন ভোট মেশিনে কাউন্ট করতে হবে। কিন্তু বর্তমান সম্পাদকসহ ওরা বলেছে মেশিনে কাউন্ট করবে না। ম্যানুয়ালি করবে। এজন্য স্যার অন্যায় ইচ্ছা পূরণের দায় নিতে চাননি।’

তিনি আরও বলেন, নির্মমভাবে আইনজীবীদের গায়ে পুলিশ হাত তুলেছে। এ ঘটনায় আইনজীবীদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। আগে সুপ্রিম কোর্ট যা করতেন, তা-ই হতো। এখন সমাজে পুলিশ আমাদের ওপর শাসন করছে, এটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। এ অবস্থার উন্নতি করতে হলে আরও ৫০ বছর এটা নিয়ে কাজ করতে হবে। এক দুই বছরে এই ইমেজ সংকট কাটবে না। এখানে নির্লজ্জভাবে পুলিশ মোতায়েন করেছে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস এবং প্রধান বিচারপতির অফিস। প্রধান আইন কর্মকর্তা ও তার অফিস পুলিশি ব্যবস্থায় এই নির্বাচনকে সমর্থন করেছে। এর পেছনে মদদ দিয়েছে একটি দালাল শ্রেণি। তাদের আস্ফালন দেখতে দেখতে অনেকেই আত্মসম্মানের জায়গা থেকে প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। এখন মুখ খোলার সময় এসেছে বলেও মনে করেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতির দুদিনব্যাপী ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এই ভোটে অংশ নেননি সমিতির বিএনপি সমর্থক ও সমমনা আইনজীবীরা। একতরফা ভোটে সভাপতি, সম্পাদকসহ সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির ১৪টি পদেই আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা বিজয়ী হয়েছেন।

সমিতির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। তপশিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান কে হবেন, সেই দ্বন্দ্বে জড়ান দুপক্ষের আইনজীবী নেতারা। পরে ঐকমত্যের ভিত্তিতে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান করা হয় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের নেতা, সাবেক বিচারপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মনসুরুল হক চৌধুরীকে। কিন্তু ১৩ মার্চ সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। এ অবস্থায় গত মঙ্গলবার বিএনপি ও আওয়ামী সমর্থক আইনজীবীরা ফের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েন। সমিতির আওয়ামী ফোরামের নেতারা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মনিরুজ্জামানকে প্রধান করে, আর বিএনপি সমর্থকরা সমিতির সাবেক সহসভাপতি এ এস এম মোক্তার কবিরকে প্রধান করে পৃথক নির্বাচন পরিচালনা উপকমিটি গঠন করেন। বিষয়টি নিয়ে দুপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা যায়।

এর মধ্যেই বুধবার আওয়ামী লীগ সমর্থকরা একতরফা ভোট গ্রহণ শুরু করেন। এতে বাধা দেয় অন্যপক্ষ। একপর্যায়ে আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও ভোটে আওয়ামী লীগ ফোরামের সভাপতি প্রার্থী মমতাজ উদ্দিন ফকির পুলিশ ডাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সমিতির মিলনায়তনে কয়েকশ পুলিশ প্রবেশ করে। তারা বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করতে লাঠিচার্জ শুরু করলে প্রায় ১৫ আইনজীবী আহত হন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ঢোকা সাংবাদিকরা ঘটনার ছবি, ভিডিও নিতে থাকেন। এতে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয় পুলিশ। সাংবাদিকদেরও বেধড়ক লাঠিপেটা করলে এনটিএন নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাভেদ আক্তারসহ ১০-১২ গণমাধ্যম কর্মী আহত হন। ভোট গ্রহণ শেষে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নির্বাচন পরিচালনা কমিটি জানায়, দুদিনব্যাপী নির্বাচনে ৮ হাজার ৬২০ ভোটারের মধ্যে ৪ হাজার ১৩৭ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া জাজিরার বড়কান্দি ইউনিয়ন ভূমি অফিস

মীন রাশিতে কাজে সফল হওয়ার দিন আজ

২৭ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব এলাকায় যাবেন না

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

প্যারিসে ভাষা দিবস উপলক্ষে পঞ্চ কবির গানের সন্ধ্যা

বাবাকে কুপিয়ে জখম, ছেলে গ্রেপ্তার

আধিপত্য বিস্তারে দুই গ্রুপের ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ৩

পথ হারানো ৩১ দর্শনার্থীকে উদ্ধার করল পুলিশ

শিক্ষা সফরে মদপান, দুই শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত

১০

মিয়ানমারে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিদ্রোহীরা!

১১

রাতের ঢাকায় নতুন মাদক

১২

বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন এর কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

১৩

রংপুরকে উড়িয়ে ফাইনালে লিটনের কুমিল্লা

১৪

যুগান্তরের অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে

১৫

ভিকারুননিসার শিক্ষক মুরাদ গ্রেপ্তার

১৬

যৌন হয়রানির অভিযোগে ভিকারুননিসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা

১৭

করোনায় আক্রান্ত ডিবি প্রধান হারুন

১৮

‘বঙ্গবন্ধু বিচ’ নামকরণের প্রস্তাব বাতিল

১৯

বর্ণাঢ্য আয়োজনে চবি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের নবীনবরণ

২০
X