সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৩, ০৩:১০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

নজরুলের বিদ্রোহের সাহস ও নতুন মূল্যবোধের নির্মাণ

কবি হিসেবে নজরুলের সঙ্গে শেলি-বায়রনের বিদ্রোহের তুলনা সচরাচর করা হয়ে থাকে। কিন্তু সুইনবার্নের সঙ্গে তার বিদ্রোহী প্রকৃতিটির সাদৃশ্যই বোধকরি অধিক স্পষ্ট। সুইনবার্নও ঝড়ের অশান্ত বিদ্রোহী শিশু ছিলেন। কবি হিসেবে সুইনবার্নের মতোই নজরুলের চেতনাও পরিণতির পথে সুস্পষ্ট রেখা ধরে বিকশিত হয়নি। কিন্তু এ দুজন কবির ভেতর বড় সাদৃশ্য যা, তা তাদের উভয়ের প্রকৃতিতে স্ববিরোধিতা। সুইনবার্ন বিদ্রোহের অশান্ত হাত উত্তোলন করেছেন, আবার অন্যত্র তিনি বাত্যা-পরিশ্রান্ত নদীর মতো ঝিমিয়ে এসেছেন আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে। নজরুলেও তাই। খোদার আরশ ভেদ করে ওঠার অপরিসীম দম্ভোক্তি সহকারে যিনি আপনাকে ছাড়া অন্য কাউকে কুর্ণিশ জানাতে অস্বীকার করেছেন, তিনিই আবার ভক্তিনিষ্ঠ আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে সর্বশক্তিমানের প্রেম ও করুণা কামনা করেছেন। সব বিদ্রোহীর ভেতরই বুঝি এমন স্ববিরোধিতা থাকে। বায়রন সম্পর্কে গ্যেটে বলেছেন, চিন্তা করতে গেলেই সে বিদ্রোহী শিশু হয়ে পড়তেন। শেলি তো আগাগোড়াই ছিলেন ঝড়ের মতো। অর্থাৎ কোমল-কঠিনের সংমিশ্রণে এ বিদ্রোহীরা গঠিত এবং এ কথাও তো সত্য যে, শক্তিমান পুরুষের ভেতরের কোমলতাটাই সুস্থ; দুর্বলের কোমলতার নাম ভীরুতা। আর শক্তিমান যে সেই বেশি করে কোমল হতেও জানে; যে ফলটির ওপরের আবরণ শুষ্ক-কঠিন তার ভেতরের কোমলতাটা অধিকতর সুস্বাদু। কবিতা রচনার সময় সুইনবার্ন অনেক ক্ষেত্রেই ছন্দের গতিতে উদ্বেলিত চিত্তে এগিয়ে চলতেন, শুরুর মতো সে কবিতা শেষও হতো আপনার নিয়মেই, ছন্দের গতি যখন থেমে আসত তখনই। অর্থাৎ ছন্দের লঘু পাখায় ভর করে যাত্রা করতে কবি অনেক সময় অভ্যস্ত ছিলেন। নজরুলকেও অনেক সময় দেখি চলার আবেগেই এগিয়ে চলেছেন আর থেমেছেন আবেগের ক্লান্তিতে। এ জন্যই তার ছন্দের প্রবাহ আমাদের এত আকৃষ্ট করে, আমাদের পাঠকচিত্তকে চলার তালে তালে নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে যায়। সত্যেন দত্তের কবিতাতেও এ গুণটি আছে, কিন্তু নজরুল সত্যেন দত্ত থেকে পৃথক। পার্থক্য নজরুলের আবেগের গভীরতায় ও আন্তরিকতায়। প্রচলিতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ধ্বনি যারা তোলেন, তাদের কণ্ঠে বেদনার একটা সুর চিরকালই লক্ষ করা গেছে।

কালের সংজ্ঞায় বর্তমানের হলেও মনের দিক থেকে তারা বর্তমানের নন। সাধারণ্যে নিয়ম বলে যা প্রচলিত তারা তাকে গ্রহণ করতে পারেন না, সমর্থন তো নয়ই। আর ভবিষ্যৎকেও তারা সবসময় ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হিসেবে বিচার করতে সক্ষম হন না। তাদের অবস্থান বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যবর্তী স্থানে। এ অস্বস্তিকর অবস্থার বেদনাটা সবসময়ই তাদের কণ্ঠে ধ্বনি-প্রতিধ্বনির সৃষ্টি করে। নজরুলও সে নিয়মের ব্যতিক্রম নন। তার সব আক্ষেপ, সব অস্থিরতা, সব উচ্ছ্বসিত অতিকথন, সব বিদ্রোহের ভেতরই বেদনার সুর কখনো উচ্চারিত, কখনোবা অন্তর্লীন ধারায় প্রবহমান। কিন্তু সুখের কথা এই যে, জীবনের প্রচলিত রূপটিতে বিরক্তিকর অসম্পূর্ণতা তিনি দেখেছেন, বীভৎসতা হয়তো দেখেছেন তার চেয়েও বেশি, কিন্তু সব হতাশার ভেতরও জীবনের যে একটি অনির্বাণ গৌরব-শিখা আছে তাকে তিনি ভোলেননি। তা না করে তিনি যদি ক্রোধ ও দীর্ঘশ্বাসের সীমিত বন্ধনে আবদ্ধ থেকে একই চিন্তার কণ্ডূয়ন-সর্বস্ব হয়ে পড়তেন, এমনকি ম্যাথু আর্নল্ডের মতো প্রতিভাবান ও প্রাজ্ঞ কবিও যাকে এড়াতে পারেননি, তাহলে সেটা নিশ্চয়ই ক্ষোভের কারণ হতো। অসম্পূর্ণ বর্তমান ও অসমর্থনীয় প্রচলিতের বিরুদ্ধে নজরুল যেমন বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন, জীবনের দুই কূলে পুঞ্জীভূত আবর্জনার স্তূপ দেখে যেমন বিক্ষুব্ধ হয়েছেন; আবার তেমনি সব অসুন্দরের ভেতরও আদর্শ সৌন্দর্যের চর্চায় তাকে নিবিষ্ট দেখেছি। কখনো প্রকৃতির সৌন্দর্য তাকে মোহিত করেছে আবার কখনো প্রিয়ার সৌন্দর্যের রহস্য উদ্ঘাটনে তিনি তন্ময় হয়েছেন। তার রচিত গানে সুন্দরের ধ্যান-বিমুগ্ধ কবির যে চেহারাটি ধরা পড়েছে তাও বিস্ময়কর। ষোড়শ শতাব্দীর ইংল্যান্ডের রেনেসাঁসের দিগন্ত-জয়ের বল্গাহীন বাসনা যেমন মার্লোর বেগশালী ব্ল্যাঙ্ক ভার্সের ভেতর দিয়ে উপচে পড়েছিল, নজরুলের কবিতার মধ্যেও সমকালীন অশান্ত মানসিকতা তেমনি টগবগ করে ফুটেছে। যে মার্লো প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড শব্দের সংস্থাপনে দীর্ঘ লাইনে ব্ল্যাঙ্ক ভার্স রচনা করেছেন, সৌন্দর্যের বর্ণনায়, প্রেমিকের উক্তিতে তিনিই আবার অসাধারণ রকম আবেগ-উদ্দীপ্ত। এর পেছনে যে নিটোল সৌন্দর্যবোধ ও শক্তিমন্ত সুস্থ চেতনার ছাপ ছিল, নজরুলের কবিতাতেও তার নিদর্শন পাই। বিদ্রোহ ও প্রেম-উভয় ক্ষেত্রেই একটি স্বাস্থ্য-ধন্য মানুষের কণ্ঠস্বর ধ্বনিত।

ব্যথিতমুখ দারিদ্র্যের যে স্বস্তিহীন পরিবেশে নজরুলের জন্ম ও বিকাশ তাতে হতাশা ও হীনচেতনাই তার পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। তার পরিবেশের আর পাঁচটি মানুষ জীবনের দুর্বিষহ বোঝার ভারে হতশ্বাস, হীনবীর্য। কবি হিসেবে পলাতক মনোবৃত্তির অধিকারী তিনি যদি হতেন সেটা বিস্ময়ের কারণ হতো না। কিন্তু প্রচণ্ড আশাবাদ ছিল তার কাব্য-চেতনার একটি প্রধান লক্ষণ। এ আশাবাদ সন্ত্রাসবাদীদের আশাবাদের সমধর্মী। প্রবালের মতো নিজেদের বিনষ্ট করে দ্বীপ গড়ার মধ্যে যারা জীবনের সার্থকতা দেখতেন, নিশ্ছিদ্র রাত্রির আত্মঘাতী তপস্যায় যারা নতুন প্রভাতের ছায়া দেখতেন, নজরুলের আশাও সে প্রকৃতির। সেখানে ভবিষ্যতের চাইতেও বর্তমানটাই বেশি করে সত্য, কেননা বর্তমানই হচ্ছে ভবিষ্যতের ধারক। তাই ভবিষ্যতের জন্য তিনি ততটা ব্যগ্র ছিলেন না, যতটা ব্যস্ত ছিলেন বর্তমানকে নিয়ে। এ জন্যই নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তিনি বর্তমানের কবি। যে অর্থে মধুসূদন তার যুগের কবি ছিলেন, নজরুলও প্রায় সেই অর্থেই তার কালের কবি।

সব বিচারকার্যেই দৃষ্টির নিরাসক্তি ও নিরপেক্ষতার প্রয়োজন সর্বাগ্রে। শিল্প বিচারে এ প্রয়োজন অপরিহার্য। একটা আশঙ্কার কথাও হয়তো এখানে বলা চলে। আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই যেসব সাহিত্য প্রতিভার ভাগ্যে প্রচুর হাততালি জোটে, জীবিতকালে তাদের মূল্যায়নে অতিকথন ও অতিউচ্ছ্বাসের প্রাবল্য দেখি। আবার ঠিক সেই যুগটা পেরিয়ে গেলেই এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ হুজুগের বিপরীত ব্যাপারটাই ঘটে, অর্থাৎ ঠিক পরবর্তী যে যুগ সেটা ব্যস্ত থাকে সেই প্রতিভার ছিদ্রানুসন্ধানে। ভিক্টোরীয় যুগের সাহিত্যের উৎকর্ষ নিয়ে সমকালীন মানুষের উৎসাহের অন্ত ছিল না। সে যুগ কেটে গেলে ভিক্টোরীয় যুগের দোষানুসন্ধানটাই হয়ে দাঁড়ায় রেওয়াজ, আজ পর্যন্ত আমরা ভিক্টোরীয় যুগ মানে অগভীর ভাবাবেগ—এমন মত শুনতে অভ্যস্ত রয়েছি। সে যাই হোক, নজরুলের কাব্যবিচারের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাসক্তি ও নিরপেক্ষতা লাভের সময় এখনো আসেনি। তার কাব্যধারার সঙ্গে আমাদের চেতনার সম্পর্কটা এখনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের। সে ধারা থেকে এখনো আমরা এমন দূরত্বে দাঁড়িয়ে নেই যাতে করে বৃহত্তর বা সমগ্রতর পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলের কাব্যবিচার সম্ভবপর হবে। কিন্তু এ কথা আমরা বলতে পারি যে, তার কবিতা আমাদের সহানুভূতিকে বিস্তৃত, চেতনাকে তীক্ষ্ণ এবং মনকে উদার করেছে। কবিতার মূল্যবিচারে এদের যদি কোনো মূল্য থাকে তবে নজরুলের কবিতা নিশ্চয়ই মূল্যবান। আমাদের রুচি গঠন এবং চেতনার বিকাশেও তার কবিতার ভূমিকা আছে।

নির্মীয়মাণ পূর্ব-পাকিস্তানি সাহিত্যের স্বতন্ত্র-চরিত্রে যারা আস্থাবান ছিলেন তাদের কাছে অন্য একটি দিক দিয়ে নজরুলের প্রতিভা মূল্যবান, কেননা প্রাচীন পুথি সাহিত্যে যে সাহিত্যরীতি প্রচলিত ছিল আধুনিককালে নজরুলই প্রথম তাকে নতুন চিন্তার প্রকাশমাধ্যম হিসেবে সার্থকভাবে ব্যবহার করেন। মুসলিম ইতিহাস ও বিষয়াদি নিয়ে এর আগে আয়তনে বৃহৎ কাব্য রচনার প্রয়াস হয়েছিল সত্য, কিন্তু সেসব কাব্যে নতুন কোনো বিশিষ্ট কাব্যরীতির সন্ধান মেলেনি। মুসলিম বিষয় ও চিন্তাকে কাব্যের উপজীব্য হিসেবে গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে শব্দচয়ন, উপমা ও রূপক ব্যবহারে তিনি যে বিশিষ্টতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সমৃদ্ধ পুথি সাহিত্যের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। পুথিতে কল্পনাশক্তির যে বলিষ্ঠতা আছে নজরুলে তার সার্থক পুনর্জন্মও লক্ষণীয়। এ সত্যটির পরিপ্রেক্ষিতে নজরুলকে বিচার করতে গেলে কবি হিসেবে তার প্রতিভা এবং বিদ্রোহী হিসেবে নতুন পথে চলার সাহস ও যোগ্যতাটি অত্যন্ত স্পষ্ট রেখায় ভাস্বর হয়ে ওঠে। শক্তিমান কবির সঙ্গে সাধারণ কবির একটা বড় তফাত এই সাহসে, আবির্ভাবকালে যাকে দুঃসাহস বলেও মনে হতে পারে। দুঃসাহসী উদ্যমে নিজের কর্মজগতে প্রচলিত মূল্যবোধের জায়গায় তিনি নতুন মূল্যবোধের প্রচলন করেছেন, অগুনতি অনুরাগী ও বহু অনুকারী রেখে গেছেন। এখানেও তার কৃতিত্ব অসীম। 

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া জাজিরার বড়কান্দি ইউনিয়ন ভূমি অফিস

মীন রাশিতে কাজে সফল হওয়ার দিন আজ

২৭ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব এলাকায় যাবেন না

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

প্যারিসে ভাষা দিবস উপলক্ষে পঞ্চ কবির গানের সন্ধ্যা

বাবাকে কুপিয়ে জখম, ছেলে গ্রেপ্তার

আধিপত্য বিস্তারে দুই গ্রুপের ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ৩

পথ হারানো ৩১ দর্শনার্থীকে উদ্ধার করল পুলিশ

শিক্ষা সফরে মদপান, দুই শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত

১০

মিয়ানমারে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিদ্রোহীরা!

১১

রাতের ঢাকায় নতুন মাদক

১২

বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন এর কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

১৩

রংপুরকে উড়িয়ে ফাইনালে লিটনের কুমিল্লা

১৪

যুগান্তরের অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে

১৫

ভিকারুননিসার শিক্ষক মুরাদ গ্রেপ্তার

১৬

যৌন হয়রানির অভিযোগে ভিকারুননিসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা

১৭

করোনায় আক্রান্ত ডিবি প্রধান হারুন

১৮

‘বঙ্গবন্ধু বিচ’ নামকরণের প্রস্তাব বাতিল

১৯

বর্ণাঢ্য আয়োজনে চবি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের নবীনবরণ

২০
X