মাওলানা মুফতি আরিফ খান সাদ
প্রকাশ : ২৮ এপ্রিল ২০২৩, ০৯:০২ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ইবাদতের প্রভাব থাকুক বছরজুড়ে

ইবাদতের প্রভাব থাকুক বছরজুড়ে
মুসলমানদের জীবনে পরিবর্তনের আলোকবর্তিকা নিয়ে এসেছিল ইবাদতের বসন্ত মাস পবিত্র মাহে রমজান। রমজানের পর উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়েছে ঈদুল ফিতর। রমজানে মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা করে যে ইবাদতমুখিতা গড়ে ওঠে, রমজান সমাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা যেন ভাটা পড়ে যায়। মূলত রমজানে তাকওয়া ও আল্লাহভীতির যে অভ্যাস গড়ে ওঠে, তা পুরো বছর চলার পাথেয়। এক মাসের অনুশীলন সারা বছর আমাদের ত্যাগ ও সংযমের জন্য সহায়ক হয়। তাই রমজানের শিক্ষা যেন ভুলে না যাই। বরং বছরজুড়ে এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা চাই। কেননা রোজা নিছক উপবাস থাকা, পানাহার ও কামাচার বর্জনের নাম নয়। এর বিশেষ তাৎপর্য ও দর্শন রয়েছে। রয়েছে এর দৈহিক, আত্মিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপকারিতা। রমজানের এ সর্বব্যাপী শিক্ষার আলোকে সারা বছর নিজের জীবন পরিচালিত করতে না পারলে নিছকই উপবাস থাকা ছাড়া রমজানে বিশেষ কোনো অর্জন নেই। দীর্ঘ একটি মাস রাত জেগে তারাবি-তাহাজ্জুদ ও দিনভর সিয়াম সাধনায় ইবাদতের একটি অভ্যাসে জড়িয়েছেন মুসলমানরা। পবিত্র রমজানের ইতিবাচক সে বিষয়গুলো জীবনভর ধরে রেখে সব ধরনের গুনাহের কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারলেই সামনের সময়গুলো হবে সফল ও সার্থক। পবিত্র রমজানে অতিরিক্ত যেসব আমল আমরা শুরু করেছিলাম, সেগুলো যেন রমজানের পর বন্ধ না হয়ে যায় এবং যেসব গুনাহের কাজ ও বদভ্যাস রমজানে ত্যাগ করেছিলাম, সেগুলো যে রমজানের পর আবার চালু না হয়ে যায়। নিয়ত করলেই যে আমরা বদভ্যাস ছেড়ে দিতে পারি, এর অনন্য প্রমাণ ছিল রোজা। যেমন একজন ধূমপায়ী কিন্তু রোজা রাখতে গিয়ে রোজার দিনে ধূমপান করেননি। তার মানে তিনি চাইলেই ধূমপান ছেড়ে দিতে পারেন। তাই রমজান-পরবর্তী সময়গুলোতেও আমাদের কর্তব্য, নেক কাজগুলো চালিয়ে যাওয়া এবং গুনাহের কাজগুলো থেকে দূরে থাকা। পবিত্র রমজান মুসলমানদের জীবনে ইবাদতের সঙ্গে বিশেষ অন্তরঙ্গতা গড়ে তোলে। কোরআনের সঙ্গে ভালোবাসা স্থাপন করে। হালাল উপার্জনের প্রেরণা দেয় এবং পরিশ্রমের মানসিকতা তৈরি করে। মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে চলার শিক্ষা দেয়। হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি ও অহংবোধ ভুলে গিয়ে সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধিশালী সমাজ প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়। রমজানের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, ত্যাগ ও সংযমের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা তথা খোদাভীতি অর্জন। রোজা অবস্থায় আমরা মিথ্যা কথা, গীবত, চোখলখুরি, মূর্খতা ও অসৎ কাজ থেকে বিরত ছিলাম। তেমনি রমজানের পরও আমাদের সেগুলো বর্জন করে চলতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না, তার এ পানাহার বর্জন করা বা রোজা রাখায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি : ১৯০৩)। অর্থাৎ রোজা রেখে যেমন মিথ্যা কথা, অসৎ কাজ ও মূর্খতা পরিহার করতে হয়, তেমনি রমজানের পরও এ চর্চা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। পবিত্র রমজান মাগফিরাত ও ক্ষমা অর্জনের মাস। এ মাস পাওয়ার পরও যারা তাদের আমলনামা পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত করতে পারেনি রাসুল (সা.) তাদের ধিক্কার দিয়ে বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলোয় ধূসরিত হোক, যে রমজান পেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না।’ (তিরমিজি : ৩৫৪৫)। অতএব রমজান-পরবর্তী সময় আমাদের সব ধরনের গুনাহ ও পাপমুক্ত জীবনযাপন করতে হবে। সামনের এগারোটি মাস গুনাহ ও পাপাচারমুক্ত থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট থাকতে হবে। পাশাপাশি পার্থিব লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরচর্চা, পরনিন্দা, মিথ্যাচার, প্রতারণা, অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা প্রভৃতি থেকে দূরে থাকা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ, মিতাচার, মিতব্যয়িতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার শিক্ষা বছরজুড়ে ধরে রাখা। বরং এভাবেই যেন গড়ে ওঠে পুরোটা জীবন। কৃপণতা একটি আত্মিক ব্যাধি। মাহে রমজান আমাদের ত্যাগী ও সংযমী হতে শেখায়। কিছু মানুষ আছে যারা অর্জিত সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে। আল্লাহর পথেও খরচ করে না, নিজের জন্যও খরচ করে না। রমজান আমাদের সম্পদদানের দিকে উৎসাহিত করেছে, নিবেদিত হতে শিখিয়েছে। এ মাসে আমরা অধিক পরিমাণ দান সদকা, জাকাত, ঈদের দিন সদাকাতুল ফিতরসহ ইত্যাদি নানাভাবে দানের চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু রমজানের পরও এগারোটি মাস আমাদের সব ধরনের কৃপণতা পরিহার করে আল্লাহর দেওয়া সম্পদ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী বেশি বেশি দান সদকা করা এবং গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানো। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যাদের অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়, তারাই মূলত সফলকাম।’ (সুরা তাগাবুন : ১৬) একজন মুমিন সর্বদাই আল্লাহর আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে এমনটাই স্বাভাবিক। শুধু রমজানের জন্যই নয়, একজন মুসলিমের জন্য সর্বাবস্থায় হারাম ভক্ষণ করা কবিরা গুনাহ। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে শরীর হারাম খাবার দ্বারা গঠিত তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (তিরমিজি : ৬১৪)। পবিত্র রমজানের সিয়াম সাধনা ইসলামের অন্যতম ভিত্তি ও মহান আল্লাহর ফরজকৃত একটি বিধান ছিল। আমরা তা যথাযথভাবে আদায় করার চেষ্টা করেছি। এভাবেই প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের কোরআন ও সুন্নাহর বিধানগুলো মেনে চলতে হবে। ইসলামের বিধিনিষেধের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আল্লাহতায়ালা যেসব হালাল ও আদেশ করেছেন, তা পালনে সচেষ্ট হতে হবে এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন তা পরিহার করতে হবে। অসুস্থ ব্যক্তি ও মুসাফিরের জন্য রমজানের রোজা ছাড়ার অনুমতি ছিল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাসটিতে (রমজানে) উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। তবে যে ব্যক্তি অসুস্থ বা মুসাফির—সে অন্যদিনে সংখ্যা পূরণ করে নেবে, আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা : ১৮৫)। মুসাফির এবং অসুস্থ ব্যক্তির মতো হায়েজ ও নেফাসগ্রস্ত নারীর জন্যও রোজা ছাড়ার অনুমতি আছে। তেমনি নিজের অথবা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীরও রোজা ছাড়ার অনুমতি ছিল। এসব কারণে যারা রমজানের রোজা ছেড়েছেন তাদের সেই ছুটে যাওয়া রোজাগুলো আদায় করে নেওয়ার সবচেয়ে উপযোগী সময় হলো রমজান-পরবর্তী শাওয়াল মাস। বিলম্বে আদায় জায়েজ হলেও যত সম্ভব তাড়াতাড়ি আদায় করে নেওয়া উচিত। কেননা প্রয়োজনীয় সময় পেয়েও তা আদায় না করলে এ অবস্থায় মৃত্যু হলে রোজা ছেড়ে দেওয়ার জন্য গুনাহগার হয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে। মুসাফির এবং অসুস্থ ব্যক্তির মতো যাদের জন্য রোজা ছাড়ার অনুমতি ছিল, তারা ব্যতীত অন্য কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা স্ত্রী সম্ভোগের মাধ্যমে একটি রোজাও ছাড়েন তাহলে এর জন্য কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হয়। রোজার কাফফারা হলো বিরতিহীনভাবে ৬০টি রোজা রাখা কিংবা ৬০ জন মিসকিনকে দুবেলা পেট পুরে খাদ্য দেওয়া। মুমিনের জন্য আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের পর প্রথম ফরজ বিধান হলো, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ সময়মতো আদায় করা। রমজানে আমরা নামাজের ব্যাপারে অনেকটা যত্নবান হলেও রমজানের পর মসজিদে এ উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না। কিন্তু নামাজ সর্বাবস্থায় একটি ফরজ বিধান। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির জন্য মৃত্যু পর্যন্ত পালনীয় বিধান। হাদিসে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন বান্দাকে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব গ্রহণ করা হবে। যদি তা সঠিক হয় তবে তার সব আমলই সঠিক হবে, আর যদি তা বাতিল হয় তবে তার সব আমলই বাতিল হয়ে যাবে।’ (মুজামুল আওসাত : ১৮৫৬)। তাই নামাজের ব্যাপারে আমাদের খুব যত্নবান হতে হবে। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলে সর্বাবস্থায় সবখানে পুরুষের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ। সুতরাং রমজানের পরও নামাজ আদায়ের ব্যাপারে কঠোর সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। রমজানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও তাৎপর্য হলো ‘তাকওয়া’ অর্জন। রমজানের রোজা পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য সুরা বাকারায় আল্লাহতায়ালা উল্লেখ করে বলেন, ‘যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ মুমিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘তাকওয়া’ বা ‘আল্লাহভীতি’। আমার প্রতিটি কাজে, প্রতিটি পদক্ষেপে মহান আল্লাহ সর্বদা দেখছেন। প্রতিটি কর্মের জন্য তার কাছে জবাবদিহি করতে হবে—এ অনুভূতি সর্বদা মনে দৃঢ়ভাবে জাগ্রত রাখা ও মহান রবের সব ধরনের আদেশ-নিষেধ মেনে চলাই হলো তাকওয়া। মহান আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে দামি যে তাকওয়াবান। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানী যে অধিক মুত্তাকি।’ (সুরা হুজুরাত : ১৩)। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের শিক্ষা সারা বছর অটুট রাখার তাওফিক দিন; বাকি এগারোটি মাস রমজানের এসব শিক্ষার ওপর যেন চলতে পারি ও আমল করতে পারি। লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

২৪ জুলাই : নামাজের সময়সূচি

সীমিত পরিসরে খোলা থাকবে ব্যাংক, লেনদেন ৪ ঘণ্টা

সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব : আহসান খান চৌধুরী

লন্ডন থেকে তারেক রহমানের নির্দেশে হামলা চালানো হয় : হারুন

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সেনাপ্রধানের সাক্ষাৎ

কারখানা চালু থাকলে শ্রমিকরা ভেতরে নিরাপদ থাকবে : বিকেএমইএ সভাপতি

কোটা ইস্যু আরও আগেই সমাধান করা যেত : ইসলামী ছাত্র আন্দোলন

শিল্প-কলকারখানা খুলে দেওয়ার আহ্বান : নাসিম মঞ্জুর

কবে থেকে চলবে যাত্রীবাহী ট্রেন, জানা যাবে বুধবার

আইডি কার্ডই হবে পোশাকশ্রমিকদের কারফিউ পাস

১০

এটি একটি অর্গানাইজড ক্রাইম : বিএবি চেয়ারম্যান

১১

জাহাজ ভাঙা শিল্পে শীর্ষে যেতে পারে বাংলাদেশ : নরওয়ে রাষ্ট্রদূত

১২

পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় রাজধানীবাসী

১৩

শৈলকুপা উপজেলা আ.লীগ সভাপতিকে হত্যাচেষ্টা

১৪

ছাত্রদের দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণিত হলো : রুহিন হোসেন প্রিন্স

১৫

এখনো বন্ধ মোবাইল অপারেটরের ইন্টারনেট

১৬

সরকারের বিজয় ও জনগণের পরাজয় হয়েছে : জি এম কাদের

১৭

ছাত্র আন্দোলনের বিজয় হয়েছে : ডা. শহীদুল্লাহ সিকদার

১৮

কোটাসংক্রান্ত রায়ের প্রতিক্রিয়া / শিক্ষার্থীরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে : রাশেদ খান মেনন

১৯

মুক্তিযোদ্ধাদের নিগৃহীত হওয়ার মানে হয় না : কাদের সিদ্দিকী

২০
X