সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৩, ১১:১৩ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমাচার

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সমাচার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের রাজনৈতিক বক্তব্যে খোদ রাজনৈতিক নেতারাও চমকে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেছেন, বর্তমান সংসদ ও সরকারের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো প্রয়োজন। বক্তব্যটি তিনি দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির এক মানববন্ধনে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক কীভাবে এমন অগণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কথা বলতে পারেন, সে নিয়ে তোলপাড় চলছে। কিন্তু এ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কতটা আর বিশ্ববিদ্যালয় আছে, শিক্ষকরা কতটা শিক্ষক আছেন সে আলোচনাটি কোথাও নেই। উচ্চশিক্ষার প্রধানতম বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কেও আলোচনার সময় এর অতীতের সব রাজনৈতিক অর্জন নিয়ে বহু কথা উচ্চারিত হয়, কিন্তু একাডেমিক অর্জন কী, সে নিয়ে কেউ সরব হন না।

অধ্যাপক জামালের বক্তব্য বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। শিক্ষক সমিতি এর মধ্যেই বলেছে, এটি তার ব্যক্তিগত বক্তব্য, এর সঙ্গে সমিতির কোনো সম্পর্ক নেই। আওয়ামী লীগের একজন নেতা দেখলাম বিবিসিকে বলেছেন, এ বক্তব্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক আছে। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন কী হয়, কারা পড়ায় সেটার সম্পর্ক আছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যরা অনেক দিন ধরে আলোচনায়। তাদের স্বজনপ্রীতি, নিয়োগবাণিজ্য, কথোপকথনের মান, তথা নানা অপকীর্তির কথা এখন স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।

এতসব আলোচনার মধ্যেই সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশ কিছু অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেছে। দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১২ হাজার ২৬৩ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করার সময় ইউজিসি বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ লুটপাটের মোট ২০ খাতের তথ্য উপস্থাপন করে। এ খাতগুলো হচ্ছে—উচ্চতর স্কেলে বেতন প্রদান; বিধিবহির্ভূতভাবে পঞ্চম গ্রেডভুক্ত কর্মকর্তাকে তৃতীয় গ্রেড প্রদান; ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও স্কেল প্রদান, এমনকি যোগদানের তারিখ থেকে পদোন্নতি; অননুমোদিত পদে নিয়োগ, আপগ্রেডেশন ও বেতন প্রদান; অনর্জিত ইনক্রিমেন্ট প্রদান; বেতনের বাইরে নানা নামে উপাচার্য হিসাবে অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ; বাংলোতে বসবাস সত্ত্বেও বাড়ি ভাড়া গ্রহণ; পূর্ণ বাড়ি দেওয়ার পরও কম নেওয়ার উদ্দেশ্যে বর্গফুটের হিসাবে ভাড়া গ্রহণ; মফস্বলের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-জনবলকে সিটি করপোরেশনের হিসাবে বাড়ি ভাড়া প্রদান; এর বাইরেও সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া প্রদান; সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে সেশন বেনিফিট প্রদান; পিআরএলের পরিবর্তে এলপিআর প্রদান; বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল ভর্তুকি দেওয়া; গবেষণা-মোবাইল-টেলিফোন-ইন্টারনেট ভাতা প্রদান, নিয়মের বাইরে বই ভাতা দেওয়া; ড্রাইভারদের নবম থেকে পঞ্চম গ্রেডে বেতন দেওয়া; চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে সরকারের আর্থিক নীতিমালা লঙ্ঘন এবং যৌথ বীমা বা কল্যাণ তহবিলে অর্থ স্থানান্তর।

কেউ ভাবতে পারবে যে, একজন উপাচার্য তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, জামাই, ছেলের স্ত্রী সবাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো না কোনো পদে চাকরি দিয়েছেন! বিলাসবহুল বাংলো থাকা সত্ত্বেও একজন নিয়মিত বাড়ি ভাড়া ভাতা নিচ্ছেন! কিংবা একজন উপাচার্য শত শত নিয়োগ দিচ্ছেন পদ না থাকা সত্ত্বেও, এমনকি অবসরে যাওয়ার দিনও এরকম নিয়োগ দিয়ে গেছেন! এগুলো ঘটছে এবং সে নিয়ে তাদের কোনো বিকারও নেই। ইউজিসি এসব অনিয়ম বন্ধে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এবার ৫৫টি নির্দেশনাও দিয়েছে। গতবার দিয়েছিল ৪১টি। নির্দেশনার সংখ্যা বেড়েছে, অনিয়মও বেড়েছে। ইউজিসি আশা করে, আর্থিক অনিয়ম বন্ধে এ নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দুর্নীতি কমে যাবে। কিন্তু এসব নির্দেশনা কিংবা নজরদারির চেয়ে যে বেশি প্রয়োজন নৈতিকতা, সেটা না থাকার বিপদ নিয়ে আলোচনা করছি কম।

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যা চলে তা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যাবে না। ছাত্ররাজনীতির নামে শাসক দলের ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষক রাজনীতির একচ্ছত্র আধিপত্য, মারামারি, খুনাখুনি, ছিনতাই সবই আছে। আবাসিক হলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শাসক দলের ছাত্রসংগঠনের দয়া আর করুণায় যেভাবে বাস করে, তাকে অমানবিক বললেও কম বলা হবে। কিন্তু আমাদের সম্মানিত শিক্ষকসমাজ এসব নিয়ে ভাবেন কম। কারণ তাদেরও ব্যস্ত থাকতে হয় রাজনীতি নিয়ে। রাজনীতি করলে পদ-পদবি, পদোন্নতি, পদায়ন নিশ্চিত হয়। গবেষণা বা একাডেমিক কাজে বেশি জড়িত থাকলে পিছিয়ে পড়তে হয়। আবার একাডেমিক কার্যক্রমে ব্যাপক দুর্নীতির কথাও আলোচিত। শিক্ষকরা নিজেরাই একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে চৌর্যবৃত্তি, নকল ইত্যাদির অভিযোগ তুলছেন।

যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় পড়েছেন বা পড়িয়েছেন, এখনো পড়ছেন বা উচ্চশিক্ষা নিয়ে ভাবেন তারা যখন এগুলো দেখেন তখন হয়তো মনে মনে বলেন, না, এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় চলে না। কিন্তু চলছে। এ অবস্থায় কী করে পৌঁছল আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো? কেমন করে অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনার দুয়ার খোলা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো? এ আলোচনা জারি রাখা দরকার। যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য নির্ভর করে শিক্ষকদের যোগ্যতা ও তাদের শিক্ষকসুলভ জীবনাচারণের ওপর। তারা শিক্ষার্থীদের কাছে রোল মডেলের মতো। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শেখা আচার, আচরণ, ভাষা অশ্রাব্য ও অগ্রহণযোগ্য হলে, শিক্ষা নড়বড়ে হলে বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই শুধু নয়, রাজনীতি, প্রশাসনসহ সমাজ ও জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রই অপরিণত, অনুন্নত থেকে যাবে।আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক দিন ধরে রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ হয়। বলা হয় তারা মূলত ভোটার হিসেবে নিয়োগ পান। তাই রাজনৈতিক কর্মীর মতো শিক্ষকে ভরপুর এখন ক্যাম্পাস, অতীতের মতো মেধাবী এবং সম্মানিত অধ্যাপকদের মতো শিক্ষক এখন আর দেখা যায় না ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি ডিনদের ভূমিকা অপরিসীম। তারাই কার্যত পড়াশোনা সম্পর্কিত সবরকম কর্মকাণ্ড মাথায় রাখেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুসারে একাডেমিক দিকে উৎকর্ষের চেয়ে ডিন নির্বাচিত হচ্ছেন রাজনীতির মাধ্যমে। তাদের যেহেতু ভোট জোগাড় করে আসতে হয়, তাই তারা যতটা ভোটারকেন্দ্রিক হয়, ততটা শিক্ষানুরাগী থাকেন না। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কথা বললে সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা অবশ্যই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ইস্যুতে কথা বলবেন। মানুষ তাদের কথা শুনতেও চাইবে যদি নিরপেক্ষ বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গা থেকে কথা বলেন। এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে এমন শিক্ষক ছিলেন, দলমত নির্বিশেষে সেসব শিক্ষকের সান্নিধ্যে পেতে পারলে, তাদের কাছ থেকে কিছু শিখতে পারলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের ধন্য মনে করত। তারা আজ নেই। দেশে উচ্চশিক্ষা চলছে জটিল সমস্যার মধ্যে দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীও বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অচলাবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। হতাশাও উচ্চারিত হয়েছে তার কণ্ঠে। বিদ্যাচর্চা সেখানেই বিকশিত হয়, যেখানে শিক্ষক-গবেষকরা স্বাধীনভাবে পাঠ্য, পাঠক্রম, মূল্যায়ন ঠিক করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সহায়কের ভূমিকায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বড় ভাবনার জায়গাটাই চলে গেছে। চিন্তার সংকীর্ণতায় অসহিষ্ণুতা বাড়ে। আমাদের ভাবতে হচ্ছে তবে কি সেটাই ঘটছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে? বিশ্ববিদ্যালয়ের অলংকার, বিবেক ও অহংকার। শিক্ষক রাজনীতি যেহেতু আছে, নিশ্চয়ই রাজনীতির রং তাদেরও আছে এবং থাকবে। কিন্তু একাডেমিক অর্জনের চেয়ে রাজনৈতিক অর্জন বেশি প্রত্যাশিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকে না। শিক্ষকরা শিক্ষক থাকেন না। বিশ্ববিদ্যালয় তার মর্যাদায় থাকে না।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, গ্লোবাল টেলিভিশন

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ধর্ষণ মামলায় রায়হান গ্রেপ্তার

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে স্পেন

নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের দুই প্রকৌশলীর আর্থিক লেনদেনের ভিডিও ভাইরাল

কামাল লোহানীর পঞ্চম প্রয়াণ দিবসে উদীচীর স্মরণ সভা

রাসেলস ভাইপার মারলেই ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার

ভিজিএফের চাল আত্মসাতের অভিযোগে আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা

নারী নির্যাতন মামলায় চেয়ারম্যান কারাগারে

ডেনমার্কের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের হতাশার ড্র

বাংলাদেশের সব অর্জন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে : পলক

আফগানদের হারিয়ে সুপার এইটে শুভ সূচনা ভারতের

১০

চুরি করতে গিয়ে ছাত্রলীগ নেতা ধরা

১১

মজুদদারদের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন হচ্ছে : খাদ্যমন্ত্রী

১২

ডিমলায় বুড়ি তিস্তা নদীর বাঁধে ভাঙন, পানিবন্দি ২ শতাধিক পরিবার

১৩

রাসেল ভাইপার নিয়ে ফেসবুকে ভুয়া পোস্ট ভাইরাল, জনমনে আতঙ্ক

১৪

ঈদের ছুটিতে ছিলেন অফিসে, মিলল লাশ

১৫

ল্যাবএইডে দিনে ৭০টির বেশি এন্ডোসকপি, অস্বাভাবিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা

১৬

প্রকাশ্যে মদ খেয়ে মাতলামি, জেলে গেলেন যুবক

১৭

ওসির কেরামতিতে মায়ের কোলে ‍ফিরল শিশু

১৮

পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ সাপ, বসবাস যেসব এলাকায়

১৯

বন্যায় ঈদ আসেনি সিলেটের নিম্নাঞ্চলে

২০
X