রীতা ভৌমিক
প্রকাশ : ২৭ মে ২০২৩, ১০:৪০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

অল্প বয়সে সন্তান জন্ম ফিস্টুলার মূল কারণ

অল্প বয়সে সন্তান জন্ম ফিস্টুলার মূল কারণ

বিশ্বে প্রায় ১০ লাখ নারী জননাঙ্গের প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোগে ভুগছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশেই রয়েছেন প্রায় ২০ হাজার। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল করার লক্ষ্যে প্রসবজনিত ফিস্টুলা সম্পর্কিত দ্বিতীয় জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করেছে। সরকারিভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ফিস্টুলামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গুলনাহার বেগম বাল্যবিয়ের কারণে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় ভুগছেন। ১২ বছর বয়সে বিয়ে এবং সাড়ে ১৪ বছরে প্রথম সন্তানের জন্ম। গর্ভবতী হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ নেননি। এমনকি প্রসবের সমস্যা দেখা দিলেও চিকিৎসক না পাওয়ায় বাড়িতেই চার দিন পর মৃত সন্তানের জন্ম দেন। এরপর থেকে প্রস্রাব তার নিয়ন্ত্রণে নেই। চিকিৎসাও করাননি। শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় কারও পাশে দাঁড়াতে লজ্জাবোধ করতেন।

এই অসুস্থ শরীরে তিনি ১৪ সন্তানের জন্ম দেন। তাদের মধ্যে মাত্র তিন সন্তান জীবিত হয়। অসুস্থতার কারণে তাকে অবহেলা, দুর্ভোগ এবং বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে।

গুলনাহার বেগম বলেন, ৩৪ বছর ধরে প্রসবজনিত ফিস্টুলা রোগে ভুগছি, যার কারণে ক্রমাগত প্রস্রাব ঝরত। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে দীর্ঘদিন কোনো চিকিৎসা করাতে পারিনি। এখন সিলেটে রাকিব রাবেয়া হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ায় শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এখন শুকনো বিছানায় ঘুমাতে পারি। ভেবেছিলাম মারা যাওয়ার আগে আর কখনো শুকনো বিছানায় ঘুমাতে পারব না। তিন ছেলের সঙ্গে শান্তিতে বাস করছি।

প্রসবকালীন জটিলতা বা বিলম্বিত প্রসব প্রসবজনিত ফিস্টুলার অন্যতম কারণ। প্রশিক্ষিত ধাত্রী, চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রসব ও প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি নিশ্চিত করতে পারলেই এ সমস্যার নিরসন সম্ভব।

ফিস্টুলায় আক্রান্ত আরেক নারী শাহানা। তিনি বলেন, চৌদ্দ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। এক বছরের মধ্যে গর্ভধারণ করি। আমার শাশুড়ি খুব খুশি হয়েছিলেন কারণ তিনি দাদি হতে যাচ্ছেন; কিন্তু পরিবারের নিয়ম প্রথম সন্তান বাড়িতেই হবে। আমার শাশুড়ি প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারিতে রাজি হননি।

তিন দিন প্রসব বেদনার পর শাহানা মৃত শিশু প্রসব করেন। এক বছর পর আবার গর্ভধারণ করেন। এবারও তার শাশুড়ি সিদ্ধান্ত নেন বাড়িতেই প্রসব করাবেন। দুই দিন প্রসব বেদনার পর দ্বিতীয় মৃত সন্তানের জন্ম দেন। এরপর থেকেই প্রস্রাব ঝরা শুরু হয়। সারাক্ষণ কাপড় ভেজা থাকে। শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। প্রার্থনা করতে পারেন না। তার কাছে কেউ থাকে না। স্বামী ও শাশুড়ি দুজনেই তাকে অবহেলা করতে শুরু করেন। অবশেষে তার স্বামী সিদ্ধান্ত নেন, তিনি শাহানার সঙ্গে থাকবেন না।

শাহানা বলেন, স্বামী আমাকে দোষারোপ করে। এটি ঘটেছে আমার পাপের কারণে। আমার স্বামী আবার বিয়ে করেন। দ্বিতীয় বিয়ের পর স্বামী আমাকে খাবার ও ভরণপোষণ দেন না। বাবার বাড়িতে ফিরে এলাম। ষোল বছর ধরে এ জীবনযাপন করছি।

ফিস্টুলা নির্মূলে গর্ভবতীদের প্রশিক্ষিত সেবাদানকারী বা মিডওয়াইফাইদের মাধ্যমে গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। তাই সরকারি-বেসরকারি সচেতনতামূলক কর্মসূচি দরকার বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) নেতৃত্বাধীন ক্যাম্পেইন টু অ্যান্ড ফিস্টুলা—বিশ্বব্যাপী ক্যাম্পেইন করা হচ্ছে। এর প্রচার এবং বাস্তবায়নে বাংলাদেশেও কাজ চলছে।

২০৩০ সালে মাত্র সাত বছরের মধ্যে সফলতা আনতে হলে বাল্যবিয়ে, অল্পবয়সে গর্ভধারণ রোধ করতে হবে। মাতৃত্বকালীন সেবাগুলো নিশ্চিত করতে হবে। প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল করতে সামাজিক প্রচারের মাধ্যমে ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীদের শনাক্ত করতে হবে। রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করে দ্রুত চিকিৎসা করতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের গাইনি ও অবসের অধ্যাপক ডা. সামছাদ জাহান শেলী কালবেলাকে বলেন, গর্ভবতী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসক দেখাতে হবে। অল্প বয়সের কারণে সন্তান প্রসবের জায়গা চাপা থাকে। চিকিৎসার মাধ্যমে জায়গাটা স্বাভাবিক হয়; কিন্তু চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ধাত্রীর মাধ্যমে সন্তান প্রসব না করায় দু-তিন দিন বাচ্চা প্রসবের মুখে আটকে থাকায় প্রচণ্ড ব্যথা হয়, রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ইনফেকশন হওয়ায় প্রস্রাব ঝরতে থাকে। এ জন্য গর্ভবতী হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রথম থেকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে দু-তিন সপ্তাহ আগে ক্যাথেটর দিয়ে জায়গাটা বড় করে নেন। প্রিপারেশন নিয়ে অপারেশন করা হয়।

তিনি আরও বলেন, বিলম্বিত প্রসব বা বাধাগ্রস্ত প্রসব, বাল্যবিয়ে ও কম বয়সে গর্ভধারণ, জরায়ুতে অস্ত্রোপচার, অদক্ষ ধাত্রী বা প্রতিবেশীর মাধ্যমে ডেলিভারি করানোসহ সচেতনতার অভাবে ফিস্টুলা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে মা ও নবজাতক দুজনেই সুস্থ থাকবেন।

ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক নাতালিয়া কানেম বলেন, প্রসবজনিত ফিস্টুলা আঘাতের কারণে হয়, যা একজন নারী বা মেয়েকে প্রায়ই সামাজিক প্রত্যাখ্যানের দিকে পরিচালিত করে। দারিদ্র্যকে আরও গভীর করে। আনুমানিক ৫ লাখ নারী এবং মেয়ে এর সঙ্গে বসবাস করে। তিনি আরও বলেন, ফিস্টুলা বন্ধ করতে হবে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, সব নারী এবং মেয়ে যাতে সময়মতো প্রশিক্ষিত ধাত্রী এবং উচ্চ মানের প্রসূতি যত্নের প্রবেশগম্যতা পায়।

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রেললাইনে পানি ওঠায় ট্রেনের গতি কমানোর নির্দেশ

ধর্ষণ মামলায় রায়হান গ্রেপ্তার

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে শেষ ষোলোতে স্পেন

নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের দুই প্রকৌশলীর আর্থিক লেনদেনের ভিডিও ভাইরাল

কামাল লোহানীর পঞ্চম প্রয়াণ দিবসে উদীচীর স্মরণ সভা

রাসেলস ভাইপার মারলেই ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার

ভিজিএফের চাল আত্মসাতের অভিযোগে আ.লীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা

নারী নির্যাতন মামলায় চেয়ারম্যান কারাগারে

ডেনমার্কের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের হতাশার ড্র

বাংলাদেশের সব অর্জন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে : পলক

১০

আফগানদের হারিয়ে সুপার এইটে শুভ সূচনা ভারতের

১১

চুরি করতে গিয়ে ছাত্রলীগ নেতা ধরা

১২

মজুদদারদের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন হচ্ছে : খাদ্যমন্ত্রী

১৩

ডিমলায় বুড়ি তিস্তা নদীর বাঁধে ভাঙন, পানিবন্দি ২ শতাধিক পরিবার

১৪

রাসেল ভাইপার নিয়ে ফেসবুকে ভুয়া পোস্ট ভাইরাল, জনমনে আতঙ্ক

১৫

ঈদের ছুটিতে ছিলেন অফিসে, মিলল লাশ

১৬

ল্যাবএইডে দিনে ৭০টির বেশি এন্ডোসকপি, অস্বাভাবিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা

১৭

প্রকাশ্যে মদ খেয়ে মাতলামি, জেলে গেলেন যুবক

১৮

ওসির কেরামতিতে মায়ের কোলে ‍ফিরল শিশু

১৯

পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর ১০ সাপ, বসবাস যেসব এলাকায়

২০
X