সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০
আমজাদ হোসেন শিমুল ও আব্দুস সবুর লোটাস, রাজশাহী
প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২২, ০৩:২৭ এএম
অনলাইন সংস্করণ

রাবির ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতির জাল

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) প্রক্সি জালিয়াতির মাধ্যমে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক ছাত্র কোচিং সেন্টারের আড়ালে প্রক্সি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে জড়িত আছেন রাবিতে অধ্যয়নরত আরও কয়েকজন।

রাবিতে ভর্তি পরীক্ষার প্রায় চার মাস পার হলেও জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনো পদক্ষেপ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। অনুসন্ধানে প্রক্সি জালিয়াতির বেশ কিছু তথ্য-প্রমাণ উঠে এসেছে কালবেলার হাতে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের ২৫-২৭ জুলাই তিনটি ইউনিটে রাবির সম্মান প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা হয়। এতে বিভিন্ন ইউনিটে প্রক্সি জালিয়াতির (একজনের পরীক্ষায় আরেকজন) মাধ্যমে অনেকেই পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রশাসনের হাতে ধরাও পড়েছেন। ভর্তি পরীক্ষার শেষ দিন কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের পরীক্ষার সময় জালিয়াতিতে জড়িত কয়েকজনকে আটক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন।

ওই সময় জালিয়াতিতে জড়িত থাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মেহজাবিনকে ২ বছর, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী এখলাছুর রহমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের বায়জিদ খান ও ভর্তিচ্ছু এস এম রাহাত আমীনের এক বছর করে কারাদণ্ড দেন নির্বাহী

ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার কৌশিক আহমেদ। তবে চক্রের মূল সিন্ডিকেট এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।

ওই প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনায় আরও ১০ শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে এখন ক্লাস করছেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এমন এক শিক্ষার্থী মো. আলিফ হোসেন। রাবির ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ছাত্র মো. ফজলুল করিম ওরফে মাহিন ‘সি’ ইউনিটের গ্রুপ-২-এ (রোল ৪৬৭৯০) আলিফের হয়ে প্রক্সি দেন। আলিফ প্রক্সির মাধ্যমে ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে—রাবির লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের (একাডেমিক রোল নম্বর ১৯১০৬৪৮১২০) ছাত্র মহিবুল মোমিন ওরফে সনেট এই প্রক্সি জালিয়াতির মূল হোতা। তিনি রাবির মেধাবীদের বাগে এনে তাদের মাধ্যমে প্রক্সি সম্পন্ন করান।

অভিযোগ আছে, এ কাজে ভর্তিচ্ছুদের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা করে নেন সনেট।

অনুসন্ধানে জানা গেল, বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের পরিচালক অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র—এমন মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রক্সি পরীক্ষায় ‘এক্সপার্ট’ হিসেবে কাজে লাগান সনেট। কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়া দুর্বল শিক্ষার্থীদের টার্গেট করেন তিনি।

এমন এক কোচিং সেন্টারের পরিচালক রাবির ইইই বিভাগের ফজলুর করিম মাহিন। নগরীর বাটার মোড়ে ‘মাহিন কেমিস্ট্রি’ নামে একটি কোচিং সেন্টার চালান তিনি।

মাহিন ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে মেডিকেল, ডেন্টাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় প্রক্সি দেন। গত ১০ জুন সিয়াম মো. সিফাত-উন-নূর নামে এক ভর্তিচ্ছুর প্রক্সি হয়ে ‘ক’ ইউনিটের (রোল ২৩০১৬৫৫ ও সিরিয়াল ৮৩১৩২৮৭) পরীক্ষায় অংশ নেন। সেখানে তার সিরিয়াল আসে ৫৬১০ (১২০ নম্বরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর ৭৫.২৫)।

৩০ জুলাই দেশের ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ‘জিএসটি-ইউনিভার্সিটিস ইন্টিগ্রেটেড অ্যাডমিশন টেস্ট (গুচ্ছ) ২০২১-২২-তে ‘এ’ ইউনিটে (রোল ২২৪১১৮) সুলতানুল আরেফিন নামে আরেক ভর্তিচ্ছুর প্রক্সি দেন মাহিন। তার দেওয়া পরীক্ষায় সুলতানুল আরেফিন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। পরে তিনি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগে ভর্তি হয়েছেন বলে জানা গেছে।কালবেলা প্রতিবেদক মাহিনের কোচিং সেন্টারে গিয়ে প্রক্সির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে সব অস্বীকার করেন তিনি। পরে বিভিন্ন ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তার ছবি সংবলিত প্রবেশপত্র দেখানোর পর তিনি জালিয়াতির কথা স্বীকার করেন।

কীভাবে প্রক্সি জালিয়াতির শুরু—জানতে চাইলে মাহিন বলেন, ‘আমার বাড়ি পিরোজপুর। সনেটের বাড়িও সেখানে। সেই সুবাদে পরিচয়। আমি যখন এই কাজ থেকে বের হয়ে আসতে চাই, তখন সনেট আমাকে অনুরোধ করে বলে, সামনে ছাত্রলীগের সম্মেলন। তার রাবি ছাত্রলীগের একটি পোস্ট দরকার। তাই কিছু টাকা-পয়সা হাতে রাখা দরকার। তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে প্রক্সিতে অংশ নিই। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্সি পরীক্ষা দিয়েছি। রাবি আর গুচ্ছতে দুই ছাত্রকে চান্স পাইয়ে দিয়েছি। বিনিময়ে সনেট আমাকে ১ লাখ টাকা দিয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে রাবির ইইই বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মামুনুর রশিদ বলেন, ‘আমার ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি প্রথম শুনলাম। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তার বিচারের সুপারিশ করব। প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।’

সেই সনেট শুধু মাহিনকে দিয়েই প্রক্সি বাণিজ্য করাননি। তার বিভাগের (লোকপ্রশাসন) এক ছোট ভাই মো. শিশির আহমেদকেও প্রক্সি পরীক্ষায় বসিয়েছিলেন। তার মোবাইল ফোনে অনেকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। পরে এ প্রতিবেদক সনেটের সঙ্গে কথা বলতে রাজশাহীতে তার ফ্ল্যাটে যান। সেখানে গিয়েও সনেটকে পাওয়া যায়নি। তবে শিশিরকে পাওয়া যায় সেখানে। তখন সনেটের কক্ষে সাকিব নামে এক ভর্তিচ্ছুর মেডিকেলে ভর্তির একটি প্রবেশপত্র পাওয়া যায়।

শিশিরের কাছে সনেট সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘গত ২৮ অক্টোবর সনেট ভাই ফোন করে আমাকে নতুন বাসা দেখতে বলেছেন। বলেছেন, এই বাসায় আর থাকা যাবে না। ১২ নভেম্বর রাবি ছাত্রলীগের সম্মেলন হয়ে গেলে তিনি রাজশাহীতে আসবেন বলে জানিয়েছেন।’

৬ নভেম্বর রাবির লোকপ্রশাসন বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভর্তি পরীক্ষার পর সনেট আর বিভাগে যাননি। এমনকি তৃতীয় বর্ষের ফাইনালেও অংশ নেননি।

জানতে চাইলে লোকপ্রশাসন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর মো. নুরুল মোমেন বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার সময় সনেট নামে এক ছাত্র প্রক্সির অপরাধ চক্রে জড়িত বলে জেনেছি। আমরা বিভাগ থেকে তার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। বিষয়টি একাডেমিক কমিটির সভায় উত্থাপন করা হবে।’

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মো. ইয়াসির আরাফাত নামে এক ভর্তিচ্ছু তার নিজের ছবি দিয়ে প্রথমে ‘এ’ ইউনিটে (রোল ৭৮৯৫০) ভর্তি পরীক্ষা দিতে আবেদন করেন। পরে সনেটের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার পরামর্শ অনুযায়ী শফিউল্লাহ নামে এক ‘এক্সপার্ট’-এর ছবি আরাফাতের প্রবেশপত্রে সংযুক্ত করে পেমেন্ট সম্পন্ন করেন।

৭ জুলাই বেলা ১১টা ৫৯ মিনিটে মো. শিশির আহমেদের ছবি সংযোজন করে প্রবেশপত্র আপলোড করেন। পরীক্ষার দিন অর্থাৎ ২৬ জুলাই শিশির আহমেদ ভর্তিচ্ছু ইয়াসির আরাফাতের হয়ে পরীক্ষা দেন। ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, তিনি ৬৮.৫০ নম্বর পেয়ে ‘এ’ ইউনিটে ২৯৩ স্থান লাভ করেছেন। পরে ইয়াসির আরাফাত মেধা তালিকায় ফোকলোর বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।

এমন প্রক্সি জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনো কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা দ্রুতই নেওয়া হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাবিতে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে ১০ জন শিক্ষার্থী এবার প্রক্সি জালিয়াতিতে ভর্তি হয়েছে বলে তথ্য রয়েছে। এই অপরাধে নাটোর ও দিনাজপুরের একটি চক্র জড়িত আছে বলে জেনেছি। তাদের শনাক্তের চেষ্টা করছি। যারা ভর্তি হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক বাবুল ইসলাম বলেন, ‘প্রবেশপত্রের ছবি পরিবর্তনের কিছু ঘটনা এবার ঘটেছিল। আমরা তথ্যগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানিয়েছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আসাবুল হক বলেন, ‘জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কাজ করছি। কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে। দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটির প্রধান ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার সময় অভিযোগের ভিত্তিতে কয়েকজনকে আটক করি এবং তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। জালিয়াতির প্রমাণ পেলে আগে ভর্তি বাতিল হবে। এরপর আইন অনুসারে বিচারের আওতায় আনা হবে।’

কালবেলা অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া জাজিরার বড়কান্দি ইউনিয়ন ভূমি অফিস

মীন রাশিতে কাজে সফল হওয়ার দিন আজ

২৭ ফেব্রুয়ারি : নামাজের সময়সূচি

মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব এলাকায় যাবেন না

কী ঘটেছিল ইতিহাসের এই দিনে

প্যারিসে ভাষা দিবস উপলক্ষে পঞ্চ কবির গানের সন্ধ্যা

বাবাকে কুপিয়ে জখম, ছেলে গ্রেপ্তার

আধিপত্য বিস্তারে দুই গ্রুপের ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ৩

পথ হারানো ৩১ দর্শনার্থীকে উদ্ধার করল পুলিশ

শিক্ষা সফরে মদপান, দুই শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত

১০

মিয়ানমারে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিদ্রোহীরা!

১১

রাতের ঢাকায় নতুন মাদক

১২

বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন এর কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত

১৩

রংপুরকে উড়িয়ে ফাইনালে লিটনের কুমিল্লা

১৪

যুগান্তরের অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে

১৫

ভিকারুননিসার শিক্ষক মুরাদ গ্রেপ্তার

১৬

যৌন হয়রানির অভিযোগে ভিকারুননিসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা

১৭

করোনায় আক্রান্ত ডিবি প্রধান হারুন

১৮

‘বঙ্গবন্ধু বিচ’ নামকরণের প্রস্তাব বাতিল

১৯

বর্ণাঢ্য আয়োজনে চবি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের নবীনবরণ

২০
X